২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে সরকারের বড় লক্ষ্য।
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা মোকাবিলায় নতুন করে ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। ২০২৬ সাল থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নযোগ্য এই ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান ২০২৫’ বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় ১৭৭ থেকে ১৯২ বিলিয়ন ডলার এর বিনিয়োগ। সরকারের লক্ষ্য হলো আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা আর টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি অগ্রসর হওয়া।
গত ৭ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে মহাপরিকল্পনাটি উপস্থাপন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সেখানে পূর্ববর্তী তিনটি মাস্টার প্ল্যানের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে নতুন করে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াতে পারে ৫৯ হাজার মেগাওয়াটে। বর্তমানে এই চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। আগের মাস্টার প্ল্যানে চাহিদা অতি উচ্চাভিলাষীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল বলে সমালোচনা ছিল বিশেষজ্ঞদের। এবার সেই জায়গায় বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো। বর্তমানে দেশের প্রাথমিক জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ। এবং নতুন রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০৫০ সালের মধ্যে এই নির্ভরতা ৫০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার বাড়িয়ে মোট জ্বালানি মিশ্রণে অন্তত ৬০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে যেখানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মাত্র ২ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে, সেখানে ২০৫০ সালে তা বাড়িয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ হবে এ ক্ষেত্রে মূল ভরসা। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগে অন্তত ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খনন করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা ছিল ভর্তুকি। পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে ভর্তুকি কমিয়ে এনে বাস্তবভিত্তিক ট্যারিফ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি জিডিপির ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে এই খাতে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

পরিবেশগত দিক থেকেও এই পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। সরকার আশা করছে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। সরকারের দাবি, এই মহাপরিকল্পনা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস নিজেও বলেছেন, জ্বালানি খাত শক্তিশালী না হলে অর্থনীতির ভিত মজবুত হবে না। তাই ভবিষ্যতে গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সুশাসনের ওপর জোর দিয়ে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হবে।
সব মিলিয়ে, এই ২৫ বছরের মাস্টার প্ল্যান বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে নতুন পথে নেওয়ার এক বড় উদ্যোগ। সফল বাস্তবায়ন হলে এটি দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ই প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও খবর, বিশ্লেষণ ও আপডেট পেতে
আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সর্বশেষ বাংলা সংবাদ পড়ুন।
সব নতুন খবর জানতে এখনই নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। Home