Home Articlesরুয়াপে কি ভাড়া বেশি?

রুয়াপে কি ভাড়া বেশি?

by The Press Room
0 comments

ভাড়াটিয়া বনাম বাড়িওয়ালা , একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনা

       রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট বা রুয়াপ (RUAP) নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে এখানকার বাড়ি ভাড়া কি সত্যিই বেশি? প্রশ্নটি সহজ শোনালেও এর উত্তর ততটা সরল নয়। ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালা উভয় পক্ষেরই যুক্তিসঙ্গত অবস্থান রয়েছে, এবং বিষয়টি বুঝতে হলে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বর্তমান ভাড়ার চিত্র

     বর্তমানে রুয়াপে একটি ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া সাধারণত ২০,০০০ থেকে ২৬,০০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে, যার সঙ্গে ভবনভেদে অতিরিক্ত ২,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়। রুয়াপের ফ্ল্যাটগুলোর গ্রস আয়তন প্রায় ১৬৫৪ বর্গফুট, যেখানে ভেতরের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য জায়গা (নেট) প্রায় ১২৭৬ বর্গফুট। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ১৮,০০০ টাকা ও ভাড়া দেখা যায়।

কাছাকাছি আকারের ফ্ল্যাটের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, মিরপুরে (DOHS) ভাড়া ২২,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা এবং উত্তরা মডেল টাউনে ২৪,০০০ থেকে ৩২,০০০ টাকার মধ্যে। এই তুলনায় রুয়াপের ভাড়া উত্তরা মডেল টাউনের চেয়ে কম এবং মিরপুরের সীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যান বলছে, রুয়াপের ভাড়া আশেপাশের এলাকার তুলনায় অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী কিছু নয়।

এলাকাফ্ল্যাটের আকার (প্রায়)বর্তমান ভাড়া (মাসিক)
রুয়াপ (RUAP)১৬৫৪ বর্গফুট (গ্রস) / ১২৭৬ বর্গফুট (নেট)২০,০০০ – ২৬,০০০ টাকা + সার্ভিস চার্জ ২৫০০-৪০০০ টাকা
মিরপুর (DOHS)কাছাকাছি আকার২২,০০০ – ৩০,০০০ টাকা
উত্তরা মডেল টাউনকাছাকাছি আকার২৪,০০০ – ৩২,০০০ টাকা

ভাড়া বৃদ্ধির পেছনের প্রেক্ষাপট

    ২০২০ সালে কোভিড-পরবর্তী সময়ে রুয়াপে ভাড়া ছিল মাত্র ৮,০০০ টাকার আশেপাশে। ফলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত ভাড়া না পাওয়ায় বাড়িওয়ালাদের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। ধীরে ধীরে এলাকার সুযোগ-সুবিধা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াও বাড়তে শুরু করে, এবং রুয়াপের পাশে মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধারণত যেকোনো এলাকার সম্পত্তির মূল্য ও ভাড়া বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, রুয়াপও এর ব্যতিক্রম নয়।

ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ ও বাস্তবতা

    অনেক ভাড়াটিয়া মনে করেন, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভাড়া বৃদ্ধির হার তাদের সাধ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালারা যথাযথ পূর্ব-নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ করে ভাড়া বাড়িয়ে দেন, যা ভাড়াটিয়াদের জন্য আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের অসংবেদনশীল সিদ্ধান্ত, সংখ্যায় কম হলেও, সামগ্রিক আস্থার সংকট তৈরি করে এবং ভাড়া-সংক্রান্ত আলোচনাকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

ভাড়ার পাশাপাশি রুয়াপে বসবাসের সার্বিক খরচও ভাড়াটিয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এখানে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম মেট্রোরেল হলেও, বাসের তুলনায় এর ভাড়া কিছুটা বেশি। বিকল্প হিসেবে রিকশা ব্যবহার করা গেলেও তা নিয়মিত ব্যবহারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, কারণ এলাকায় অন্য কোনো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। ফলে সামগ্রিকভাবে যাতায়াত খরচ তুলনামূলক বেশি পড়ে।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো স্বাস্থ্যসেবা। রুয়াপে বা এর আশেপাশে কোনো হাসপাতাল বা পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। জরুরি প্রয়োজনে বাসিন্দাদের অন্তত ৬-৭ কিলোমিটার দূরে উত্তরা মডেল টাউনে যেতে হয়, যা বিশেষত জরুরি পরিস্থিতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অসুবিধা।

বাড়িওয়ালাদের দৃষ্টিভঙ্গি

     অন্যদিকে বাড়িওয়ালাদের যুক্তিও উপেক্ষা করার মতো নয়। তারা একটি বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে ফ্ল্যাট কিনেছেন এবং সেই বিনিয়োগের বিপরীতে যৌক্তিক রিটার্ন প্রত্যাশা করাটা স্বাভাবিক। এলাকায় অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মেট্রোরেলের মতো সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্পত্তির বাজারমূল্য বেড়েছে, যা ভাড়ার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হওয়া অর্থনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক নয়। প্রতিবেশী এলাকা মিরপুর ও উত্তরা মডেল টাউনের ভাড়ার সঙ্গে তুলনা করলে রুয়াপের ভাড়া প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়েই রয়েছে বলে অনেক বাড়িওয়ালা মনে করেন।

রুয়াপের উজ্জ্বল দিক

     ভাড়া নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি এটাও স্বীকার করতে হবে যে, রুয়াপ বসবাসের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান। এটি এমন একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, যেখানে মসজিদ, বাজার ও স্কুল  সবকিছুই সীমানার ভেতরে অবস্থিত। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এটি তুলনামূলক শান্ত ও নিরাপদ একটি পরিবেশ প্রদান করে।

  • ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে শিশুরা বিকেল বা সন্ধ্যায় নিরাপদে খেলাধুলা করতে পারে।
  • প্রবীণ বাসিন্দারা নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ও ব্যায়াম করার সুযোগ পান।
  • বিস্তৃত মাঠ, খোলা জায়গা ও হাঁটার পথ রয়েছে।
  • লেক-বেষ্টিত সুন্দর পরিবেশ  এলাকার সৌন্দর্য ও পরিবেশগত মান আরও বাড়িয়ে তোলে।

এই বৈশিষ্ট্যগুলো রুয়াপকে ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকার তুলনায় ব্যতিক্রমী করে তোলে, এবং একটি পরিবার-বান্ধব, সুশৃঙ্খল কমিউনিটি হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

শেষ কথা

     পরিসংখ্যান ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ বিবেচনায় নিলে, রুয়াপের ভাড়া আশেপাশের এলাকার তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি নয়  বরং তা মিরপুর Dohs ও উত্তরা মডেল টাউনের ভাড়ার সীমার মধ্যেই অবস্থান করছে। তবে ভাড়াটিয়াদের জন্য প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুধু ফ্ল্যাট ভাড়ায় সীমাবদ্ধ নয়,  এর সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত যাতায়াত খরচ এবং স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়কে বাড়িয়ে তোলে। তবে রুয়াপে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, স্থায়ী বাজার এবং হাসপাতালের মতো সেবার বিষয়টি এখনও সেবা অন্য জাগার তুলনায় খুব কম। বাড়িভাড়া একটি জায়গা নয়, বরং তার আসে পাশে সুযোগ শুভিদার উপর নির্ভর করে।

একইসঙ্গে, বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে পারস্পরিক আলোচনা ও বোঝাপড়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠলে উভয় পক্ষের সম্পর্ক আরও আস্থাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রুয়াপের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে এর পরিকল্পিত অবকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশে আর ভাড়া কিংবা বসবাসের সামগ্রিক ব্যয় বিচার করার সময় এই দিকগুলোকেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

— রুয়াপ টিভি

You may also like

Leave a Comment