ইনজুরি, সংশয় আর সংগ্রামের পরে ব্রাজিলের ১০ নম্বর ফিরে এসেছেন সবচেয়ে বড় মঞ্চে
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিলের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দলে নেইমার জুনিয়রের নাম ঘোষণা করেছেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এটি শুধু একটি দলীয় নির্বাচন নয় ,এটি হলো একজন মানুষের লড়াইয়ের স্বীকৃতি, যিনি বারবার ইনজুরির কাছে হেরে গেছেন কিন্তু কখনো হার মানেননি। ৩৪ বছর বয়সে এটি হবে তাঁর চতুর্থ বিশ্বকাপ এবং সম্ভবত শেষ।
আনচেলত্তি এর আগে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন শুধু ১০০ শতাংশ ফিট খেলোয়াড়রাই দলে জায়গা পাবেন। মার্চের ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচেও নেইমার ছিলেন না। কিন্তু সান্তোসে ফিরে আসার পর ১৩টি ম্যাচে ৬ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট, এবং রড্রিগো ও এস্তেভাওয়ের মতো আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের ইনজুরি এই দুটি বিষয় নেইমারের পক্ষে কাজ করেছে।
একটি কম আলোচিত তথ্য হলো ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ মহলে বিশ্বাস করা হয় নেইমারের উপস্থিতি দলের জন্য একটি ‘প্রেশার শিল্ড’ হিসেবে কাজ করে। বড় টুর্নামেন্টে মিডিয়া ও সমালোচকদের মনোযোগ তাঁর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, ফলে দলের অন্য খেলোয়াড়রা কম চাপে থাকেন।

নেইমারের ক্যারিয়ার যতটা প্রতিভার গল্প, ততটাই ইনজুরির বিরুদ্ধে যুদ্ধের গল্প। পিএসজিতে ছয় মৌসুমে তিনি মাত্র একটি মৌসুমেই ২০টির বেশি লিগ ম্যাচ খেলেছিলেন। ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টারফাইনালে পিঠে মারাত্মক আঘাত পান এবং ঐতিহাসিক ৭-১ হারের সেমিফাইনাল ম্যাচ মিস করেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে পায়ের মেটাটার্সাল ফ্র্যাকচার তাঁকে মৌসুমের শেষে ১৬টি ম্যাচ হারায়। রাশিয়ায় তিনি ব্যথা নিয়েই খেলেছিলেন, এবং বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টারফাইনালে বিদায় হন। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতটি আসে ২০২৩ সালের অক্টোবরে। উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাম হাঁটুর এসিএল (অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট) ও মেনিসকাস সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যায়। নেইমার নিজেই বলেছিলেন — ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।’ সার্জারির পর ৩৬৯ দিন মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। আল-হিলালে ফেরার পরেও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি। এসিএল থেকে ফিরে মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় থাইয়ে আঘাত পান। হতাশায় বুট ও শিনগার্ড ছুঁড়ে ফেলার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা ছিল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
নেইমার ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ৭৯ গোল। বিশ্বকাপে গোলে সরাসরি অবদান রাখার দিক থেকে ব্রাজিলিয়ানদের মধ্যে শুধু রোনালদো নাজারিও, পেলে ও জাইরজিনহো তাঁর চেয়ে এগিয়ে।
ব্রাজিল গ্রুপ সি-তে রয়েছে মরক্কো, স্কটল্যান্ড ও হাইতির বিপক্ষে। ১৩ জুন নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে ক্যাম্পেইন শুরু হবে। গ্রুপটি তুলনামূলক সহজ হওয়ায় নেইমারকে প্রাথমিক ম্যাচে সতর্কভাবে ব্যবহার করার সুযোগ আনচেলত্তির আছে। ভিনিসিউস জুনিয়র ও রাফিনহার পাশে নেইমারের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দলের জন্য অমূল্য। মাঠে তাঁর জাদু না হলেও ড্রেসিং রুমে তাঁর উপস্থিতি তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য বিরাট অনুপ্রেরণা।
নেইমারের বিশ্বকাপ যাত্রা কখনো মসৃণ ছিল না। ২০১৪-তে ইনজুরি, ২০১৮-তে অর্ধেক ফিট অবস্থায় খেলা, ২০২২-এ সার্জারি প্রতিটি বিশ্বকাপেই তাঁকে কোনো না কোনো যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু এবার হয়তো একটু আলাদা।
সান্তোসে ফিরে যাওয়া, দেশের মাটিতে আবার পরিচিত পরিবেশে নিজেকে গড়ে তোলা এটা কি একটা পরিপক্ব নেইমারকে সামনে এনেছে? উত্তর পাওয়া যাবে উত্তর আমেরিকার মাঠে। তবে একটা কথা নিশ্চিত যে মানুষটি এত ইনজুরি, এত সমালোচনা পার করে আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন, তাঁর গল্পটাই ইতিমধ্যে অসাধারণ।