Home রুয়াপরুয়াপ কি নতুন মনোরেল স্টেশন পাচ্ছে?

রুয়াপ কি নতুন মনোরেল স্টেশন পাচ্ছে?

by The Press Room
0 comments

ঢাকার হালনাগাদকৃত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (URSTP) এবং উত্তরা সেক্টর ১৮-এর সম্ভাবনা বিশ্লেষণ

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থা একটি বড় ধরনের রূপান্তরের মুখোমুখি। দীর্ঘদিন ধরে যানজটে জর্জরিত এই মহানগরীর জন্য ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (DTCA) সম্প্রতি “হালনাগাদকৃত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা” বা URSTP চূড়ান্ত করেছে, যা আগামী দুই দশকের জন্য শহরের পরিবহন কাঠামোর একটি বিস্তৃত রূপরেখা। এই পরিকল্পনায় বিদ্যমান ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের পাশাপাশি নতুন দুটি মেট্রো লাইন এবং সম্পূর্ণ নতুন পাঁচটি মনোরেল রুট যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রায় ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

উত্তরা সেক্টর ১৮-এর রুয়াপ (রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট) এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে; রুয়াপ কি নিজস্ব একটি মনোরেল স্টেশন পাবে? এই প্রতিবেদনে ইউআরএসটিপি-এর সবশেষ অগ্রগতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং রুট-বিন্যাস বিশ্লেষণ করে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।

ইউআরএসটিপি: প্রেক্ষাপট ও সাম্প্রতিক পরিবর্তন

ডিটিসিএ ২০২২ সাল থেকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কারিগরি সহায়তায় ২০১৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা হালনাগাদের কাজ শুরু করে। প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা খসড়ায় মনোরেলের কোনো সুস্পষ্ট অন্তর্ভুক্তি ছিল না। তবে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে মনোরেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি থাকায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় খসড়া পরিকল্পনাটি ডিটিসিএ-তে ফেরত পাঠিয়ে তা সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার নির্দেশ দেয়।

এরপর জাপানভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্য মনোরেল করিডোর যাচাই করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, যা গত ২৩ জুন, ২০২৬ তারিখে ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ইউআরএসটিপি প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল আলম এবং দলনেতা তোমোকাজু ওয়াচি এই হালনাগাদ পরিকল্পনার মূল সুপারিশগুলো তুলে ধরেন। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিদ্যমান ছয়টি এমআরটি লাইনের সঙ্গে নতুন এমআরটি লাইন-৩ ও লাইন-৮ যুক্ত করে মোট আটটি মাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন এবং পাঁচটি ফিডার মনোরেল রুটের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নয়টি টানেল, ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) এলাকা এবং যানজট ফি আরোপের সুপারিশও রয়েছে।

মনোরেল কেন প্রয়োজন?

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শহরে বড় মেট্রোরেল অবকাঠামো সব এলাকায় নির্মাণ করা সম্ভব নয়। এখানেই মনোরেলের গুরুত্ব। বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হকের মতে, সরু ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মনোরেল অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, কারণ এটি অনেক কম জায়গায় নির্মাণ করা যায় এবং নির্মাণ ব্যয়ও তুলনামূলক অনেক কম।

  • ফিডার সেবা: হালকা কাঠামোর মনোরেল কম জায়গায় নির্মিত হয়, তীক্ষ্ণ বাঁক নিতে পারে এবং ভারী মেট্রোর তুলনায় নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
  • সংযোগ স্থাপন: মনোরেলের মূল উদ্দেশ্য আবাসিক এলাকার যাত্রীদের নিরাপদে প্রধান এমআরটি স্টেশনে সংযুক্ত করা।
  • অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা: যানজটের কারণে ঢাকায় বার্ষিক প্রায় ২.৪৩ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে বলে ইউআরএসটিপি জরিপে উঠে এসেছে, যা সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এনেছে।
  • প্রযুক্তিগত সুবিধা: মেট্রোরেলে বৈদ্যুতিক তার বহনের জন্য বড় খুঁটির প্রয়োজন হয়, কিন্তু মনোরেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা মূল বিমের ভেতরেই সংযুক্ত থাকে, ফলে অতিরিক্ত অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না।

প্রস্তাবিত পাঁচটি মনোরেল রুট

ইউআরএসটিপি অনুযায়ী প্রস্তাবিত পাঁচটি মনোরেল রুট এবং তাদের সংযোগস্থলের সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে দেওয়া হলো। এর মধ্যে মনোরেল-২ সরাসরি রাজধানীর উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রুটের নামপ্রস্তাবিত অ্যালাইনমেন্টসংযুক্ত মেট্রো লাইন
মনোরেল-১বিমানবন্দর — পূর্বাচল — জলসিঁড়ি — বসুন্ধরাএমআরটি লাইন-১
মনোরেল-২বিমানবন্দর — উত্তরা সেন্টার — সাভারএমআরটি লাইন-৬ / এমআরটি লাইন-৫ (নর্থ)
মনোরেল-৩মোহাম্মদপুর — পোস্তগোলাএমআরটি লাইন-১
মনোরেল-৪মধ্য বাড্ডা — ভুলতাএমআরটি লাইন-১ / লাইন-৩ / লাইন-৮
মনোরেল-৫রামপুরা — ডেমরাএমআরটি লাইন-১ / লাইন-৬ / লাইন-৫ (নর্থ)

মনোরেল-২: উত্তরা সংযোগের বিস্তারিত

প্রস্তাবিত পাঁচটি রুটের মধ্যে মনোরেল-২ সরাসরি রাজধানীর উত্তর প্রবেশদ্বারের সঙ্গে যুক্ত। এই রুটের অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে বিমানবন্দর থেকে উত্তরা সেন্টার হয়ে সাভার পর্যন্ত। ইউআরএসটিপি অনুযায়ী, মনোরেল-২ একটি কাঠামোগত সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করবে, যা বিদ্যমান এমআরটি লাইন-৬ (উত্তরা-মতিঝিল লাইন) এবং নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-৫ (নর্থ রুট)-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সংযুক্ত হবে।

রুয়াপ (সেক্টর ১৮) কেন সম্ভাবনার তালিকায় শক্ত অবস্থানে?

মনোরেল-২ যেহেতু ঢাকা বিমানবন্দর থেকে উত্তরা সেন্টার হয়ে পশ্চিমে সাভারের দিকে বিস্তৃত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাই উত্তরা সেক্টর ১৮-এ অবস্থিত রুয়াপ এলাকা একটি কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে।

১. ভৌগোলিক করিডোর

উত্তরা সেক্টর ১৮ উত্তরার মূল কেন্দ্র থেকে সাভারের দিকে যাওয়ার স্বাভাবিক ট্রানজিট পথের ওপর অবস্থিত। “উত্তরা সেন্টার থেকে সাভার” লক্ষ্য করে একটি মনোরেল রুট তৈরি করতে হলে সেক্টর ১৮-এর মধ্য দিয়ে বা তার সন্নিকটে বিম স্থাপন করা প্রযুক্তিগত ও ভৌগোলিকভাবে যুক্তিসঙ্গত।

২. এমআরটি লাইন-৬-এর নৈকট্য

মনোরেল-২ উত্তরা সেন্টারে এমআরটি লাইন-৬-এর সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার কথা। যেহেতু সেক্টর ১৮ উত্তরা নর্থ ও উত্তরা সেন্টার টার্মিনাল এলাকার একদম কাছাকাছি অবস্থিত, তাই রুয়াপ এলাকায় একটি স্টেশন হলে তা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য একটি আদর্শ প্রতিবেশী টার্মিনাল হিসেবে কাজ করতে পারে— যা মাত্র কয়েক মিনিটে যাত্রীদের প্রধান মেট্রো ইন্টারচেঞ্জে পৌঁছে দেবে।

৩. জনঘনত্ব ও চাহিদা

সেক্টর ১৮-তে বিশাল আবাসিক ভবন ও কমপ্লেক্স রয়েছে। মনোরেল মূলত এমন ঘনবসতিপূর্ণ ও নতুন সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকার জন্য উপযোগী, যেখানে বড় আকারের ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া ভারী রেল অবকাঠামো নির্মাণ করা কঠিন। রুয়াপের বিন্যাস একটি মনোরেল ক্যাচমেন্ট স্টেশনের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হতে পারে।

বর্তমান অবস্থা: এরপর কী?

যদিও অ্যালাইনমেন্টের তথ্য উত্তরা সেক্টর ১৮-এর কাছাকাছি একটি স্টেশনের সম্ভাবনাকে শক্তিশালী সমর্থন দেয়, তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে প্রকল্পটি এখনও তার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ইউআরএসটিপি চূড়ান্ত খসড়ায় মনোরেল নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করলেও, প্রতিটি স্টেশনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণের জন্য পৃথক প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি) পরিচালিত হবে।

এখানে একটি বাস্তবসম্মত সতর্কতাও উল্লেখযোগ্য। অতীতে ঢাকার মেট্রো ও পরিবহন প্রকল্পগুলোর রুট একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে যেমন এমআরটি লাইন-৬-এর সাভার পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কারণে বাতিল করা হয়েছিল। ফলে চূড়ান্ত অনুমোদন ও নির্মাণ শুরুর আগ পর্যন্ত মনোরেল-২-এর প্রতিটি স্টেশনের অবস্থান নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে আশাবাদী থাকাই বিচক্ষণতার পরিচয়।

রুয়াপের অপেক্ষা

তাহলে, রুয়াপ কি সত্যিই একটি নতুন মনোরেল স্টেশন পাচ্ছে? চূড়ান্ত মাইক্রো-ইঞ্জিনিয়ারিং মানচিত্র এখনও প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকলেও, সম্ভাবনা অত্যন্ত ইতিবাচক।

মনোরেল-২ যেহেতু উত্তরা সেন্টার ও সাভারের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের দায়িত্ব পেয়েছে, তাই সেক্টর ১৮-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরতলি ট্রানজিট নোড হিসেবে ব্যবহার করা ডিটিসিএ-এর সামগ্রিক লক্ষ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ— আবাসিক এলাকা ও ঢাকার গণপরিবহন নেটওয়ার্কের মধ্যে ব্যবধান দূর করা। রুয়াপের বাসিন্দাদের জন্য আগামী কয়েক বছরের কাঠামোগত জরিপ হয়তো এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে— যেখানে যাতায়াত হবে আরও সহজ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-এর ইউআরএসটিপি দাখিলকরণ সেমিনার (২৩ জুন, ২০২৬), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইন্টারন্যাশনাল রেলওয়ে জার্নাল, বণিক বার্তা ও প্রথম আলোর প্রতিবেদন অবলম্বনে।

You may also like

Leave a Comment