তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ছয়টি অভিযোগই প্রমাণিত হওয়ার পর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত
উত্তরা, ঢাকা — রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টের (রুয়াপ) ব্লক-এ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মোঃ আবু বকর সিদ্দিক বিন আহমদকে অসদাচরণের অভিযোগে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে পদচ্যুত করে ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। আদেশে স্বাক্ষর করেন মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবুল মালেক।
অভিযোগের সূত্রপাত
অফিস আদেশ অনুযায়ী, পেশ ইমাম বিন আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি “Bin Ahmad” ছদ্মনামে ০১৫১৯১৩৫৭৯০ নম্বরের একটি মোবাইল সিম ব্যবহার করে মসজিদের মুসল্লি ও ইতেকাফকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি, অসন্তোষ ও অস্থিরতা সৃষ্টিকারী মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য ছড়াচ্ছিলেন। অভিযোগ তদন্তে একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যারা ৮ মে ২০২৬ তারিখে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১২ জুন ২০২৬ তারিখে বিন আহমদকে একটি কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়।
কারণ দর্শানো নোটিশে সাতটি অভিযোগ
নোটিশে তার বিরুদ্ধে সাতটি নির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয় —
- মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্দেশনায় দুইজন স্থানীয় হাফেজের পরিচালিত কিয়ামুল লাইল কর্মসূচি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো;
- ওই দুই ইমামের বিরুদ্ধে মুসল্লিদের উসকে দিয়ে মসজিদে অস্থিরতার পরিস্থিতি তৈরি করা;
- ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্দেশনা উপেক্ষা করা;
- প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে “Bin Ahmad” নামে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ক্রমাগত অভিযোগ তোলা;
- গত রমজানে ইতেকাফকারী না হয়েও নিজেকে ইতেকাফকারী পরিচয় দিয়ে মুসল্লিদের বিভ্রান্ত করা;
- আলোচিত টেলিটক সিমের মালিকানা গোপন করে কমিটির কাছে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে অস্বীকার করা; এবং
- ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য প্রচার করে মসজিদে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা।
তাকে দশ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জবাব দিতে বলা হয়।
সিম চুরির দাবি ও দ্বিতীয় তদন্ত
২৩ জুন ২০২৬ তারিখে বিন আহমদের লিখিত জবাব কমিটির কাছে পৌঁছায়। জবাবে তিনি দাবি করেন, ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে তার টেলিটক সিমসহ মোবাইল সেট চুরি হয়ে যায়, এই ঘটনায় তিনি ২২ মার্চ মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং ২৪ মার্চ মোবাইল অপারেটরের মাধ্যমে সিমটির নিবন্ধন বাতিল করেন। তার এই বক্তব্য যাচাইয়ের জন্য ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে তিন সদস্যের একটি নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার সভাপতি ছিলেন ব্যবস্থাপনা কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি মোঃ সিরাজ উদ্দিন এবং সদস্য সচিব ছিলেন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মোঃ সাইফুজ্জামান খান। কমিটির অপর সদস্য ছিলেন সাধারণ মুসল্লি মোঃ আতিয়ার রহমান।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত
এই কমিটি ১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিন আহমদ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মুসল্লিদের সাক্ষাৎকার এবং তার দাখিল করা জিডির কপিসহ অফিসের প্রাসঙ্গিক নথি পরীক্ষা করে কমিটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, প্রকৃতপক্ষে তার মোবাইল বা সিমটি হারায়নি, বরং ঘটনার সময় তা তার নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কমিটি উল্লেখ করে যে ১৮ ও ১৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে “Bin Ahmad” নামে এবং তার নিজের সিম নম্বর থেকে পাঠানো সব বার্তা তিনি নিজেই পাঠিয়েছেন।
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে কমিটি কারণ দর্শানো নোটিশের ছয়টি অভিযোগই প্রমাণিত বলে উল্লেখ করে — নেতিবাচক প্রচারণা পরিচালনা, ইমামদের বিরুদ্ধে মুসল্লিদের উসকে দেওয়া, প্রকৃত পরিচয় গোপন করে ক্রমাগত মিথ্যা অভিযোগ করা, ইতেকাফকারী না হয়েও মিথ্যা পরিচয় দেওয়া, প্রাথমিক তদন্ত কমিটির সামনে হাজির না হওয়া (যা তিনি নিজেই স্বীকার করেন), এবং ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মন্তব্য প্রচার করা।
ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত
তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে ১১ জুলাই ২০২৬ তারিখে মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অংশগ্রহণকারী সদস্যরা মত দেন যে প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মাধ্যমে তার নৈতিক স্খলন ঘটেছে এবং মুসল্লিদের মানসিক প্রশান্তি ও নামাজ আদায়ের স্বার্থে তাকে মসজিদের পেশ ইমাম পদে বহাল রাখা সমীচীন নয়। এই বিবেচনায় সভা তাকে পেশ ইমাম পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরে অফিস আদেশ আকারে জারি করা হয়।
অফিস আদেশের একটি অনুলিপি মসজিদ কমিটির সভাপতি ও রুয়াপ নোটিশ বোর্ডেও পাঠানো হয়েছে।
সুত্রঃ রুয়াপ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক জারিকৃত অফিস আদেশ I